কুমিল্লার দোলনা তৈরি করে ৩শ’ পরিবারে সচ্ছলতার ছোঁয়া, শিশুদের দোলনা ভীষণ প্রিয়। সুতা, বাঁশ ও রং দিয়ে নিপুণ হাতে বানানো হয় দোলনা। বাহারি রঙে ও সুতোর কারুকাজে ভরপুর থাকে এ দোলনা। নবজাতক থেকে শুরু করে ৩-৬ মাস বয়সী শিশুকে হাসিখুশি রাখতে মা-বাবাকে বহু কৌশল অবলম্বন করতে হয়। কখনও ঝুনঝুনি বাজিয়ে, লাল-নীল ফুল বা কোন আকর্ষণীয় বস্তু প্রদর্শন করে কিংবা কোলে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করে শিশুকে আগলে রাখতে হয়। এতেও যদি আদরের ছোট্ট শিশুটি আনন্দবোধ না করে তবে শেষ ভরসা হিসেবে তাকে দোলনায় তুলে দোলানো হয়। এ জন্য প্রয়োজন সেই নিপুণ হাতে বানানো দোল-নার।

কুমিল্লার আমিনুল বিশ বছর ধরে দোল-না বানানো ও বিক্রির পেশায় ডুবে আছেন তিনি। দোল-না বিক্রি এখন তার নেশায় পরিণত হয়েছে। এটি তাঁর রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। আমিনুল (৫০) দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে দো-লনা বিক্রি করছেন। তিনি তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দৈয়ারা গ্রামে নারীদের দিয়ে দো-লনা বানান। মাঝে মাঝে তিনি নিজেও দো-লনা তৈরি করে থাকেন। দো-লনা বানানো শেষ হলেই বিক্রির জন্য ছুটে যান রাজধানী ঢাকা ,নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায়। দো-লনায় থাকে সুতোর নানা কারুকাজ।
সুতোকে রং দিয়ে করা হয় আকর্ষণীয়। মেয়েদের চুলের বেণীর মতো করে দোলনা তৈরির সুতোগুলোকেও বেনি করা হয়। এরপর বাঁশের চটির সঙ্গে সুতো বেঁধে তৈরি করা হয় দোলনা।

সরেজমিনে দোলনার গ্রাম কুমিল্লার দৈয়ারা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, আধাপাকা বাড়ির একটি মেহগনী গাছের ছায়ায় বসে দোলনা বানাচ্ছিল এইচএসসি পরীক্ষার্থী শিরিনা। তার পাশে ও সুতার তৈরি আরও কিছু দোলনা। কুমিল্লার মুরাদনগরের পল্লীতে বাঁশের কাইম ও সুতায় তৈরি হচ্ছে এ রফতানীযোগ্য পণ্য। সারাদেশেই দোলনা নামে পরিচিত এ পণ্য উৎপাদন করে ছাত্রছাত্রী ও গৃহবধুরা বাড়তি আয় করছেন অনেকেই বদলে ফেলেছেন সংসারের চেহারা। দৈয়ারা গ্রামের শিরিনা জানায়, তারা দিনে গড়ে ৮টি দোলনা বানাতে পারে। এককটি দোলনার দাম ১৮০ থেকে ২শ টাকা পর্যন্ত। তার মত্যে অনেকেই অবসরে দোলনার কাজ করে।
গৃহবধূ পারভীন, মমতাজ, হোসনেয়ারা, রাশেদারাও বসে নেই। কাজের অবসরে দোলনা তৈরি করে এরা বাড়তি আয় করেন। মমতাজ একটা পাকা বাড়ী করছেন। তার চার মেয়ে হাজেরা, ফারজানা, ছালমা ও রীমা স্কুলে লেখাপড়া করে। তারাও যার যার সময় অনুযায়ী দোলনা তৈরী করে। তারা সকলেই এখন সচ্ছল ও স্বাবলম্বী। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেকেই এ পেশার সফল ভোগ করছেন। দৈয়ারা গ্রামের ব্যবসায়ীরা বাঁশের আঁটি বেধে ও ঢাকার মোগরাপাড়ার রহমতগঞ্জ থেকে পিকআপ ভ্যান করে নিয়ে আসেন দৈয়ারা গ্রামে। বাঁশ ও সুতার তৈরি রফতানীযোগ্য পণ্য গ্রামের বেকার অসহায় পুরুষ ও মহিলারা মনে আশার সঞ্চার করেছে।

দৈয়ারা গ্রামটিকে কেন্দ্র করে আশপাশের কয়েকটি পাড়ায় এ কুটির শিল্প ছড়িয়ে পড়েছে। কুটির শিল্প হলো কাইম ও সুতার তৈরি বিভিন্ন ডিজাইনের দোল-না। মুরাদনগরের দৈয়ারা, বাবুটিপাড়া, মধ্যপাড়া, তেলুয়ামাইনকা এ শিল্প ছড়িয়ে পড়েছে। তবে দৈয়ারা এর কেন্দ্র। কারণ এ গ্রামকে কেন্দ্র করেই শিল্প ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। জানা যায়, কবির হোসেন নামের এক ব্যক্তি সর্বপ্রথম কাজ শিখে গ্রামের দরিদ্য মানুষকে শেখান বাঁশের কাইম ও সুতার ধারা দো-লনা তৈরির কাজ। অল্প সময়ের মধ্যে কয়েক’শ মানুষ এ কুটির শিল্পের দক্ষ শ্রমিকে পরিণত হয়। দৈয়ারা গ্রামের দো-লনা ব্যবসায়ী রমিজ উদ্দিন ভূঁইয়া বাসসকে জানান, কবির যখন তার নিজ গ্রামে দো-লনা তৈরির কাজ ১৯৯৯ সালে শুরু করলো তখন গাঁয়ের মানুষ দো-লনা তৈরির কাজের চাহিদা দেখে আস্তে আস্তে এ কাজের প্রতি আগ্রহী হলো।
তখন গাঁয়ের মানুষ কবির হোসেনের কাছে কাজ শিখতে শুরু করে এবং কাজ শিখে এখন পুরো গ্রামে ৩শ’ পরিবারের বেশি এ শিল্পের সাথে জড়িত হওয়ায় কারণে দিন দিন এ শিল্পের প্রসার ঘটছে এ গ্রামে।
পঁচিশ বছর বয়সী রাশেদা বেগম দো-লনা তৈরি করেন। তিনি বাসসকে জানালেন, দো-লনা তৈরির সুতা কেনা হয় রহমতগঞ্জ থেকে। প্রথমে সাদা সুতা কেনা হয়, তারপর সেই সুতা প্রয়োজন মতো রঙ করে নেয়া হয়। সুতার রঙও কেনা হয় সোনারগাঁও থেকে। দো-লনা তৈরি করা হয় কয়েকটি মাপে। এগুলো প্রতিটি খুচরা বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। তবে পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয় প্রতিটি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা।

ঢাকা, যশোর, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে কিনে নেন এসব দোলনা। অনেক পাইকার দোলনা তৈরির অর্ডারও দেন। অনেক সময় যারা দোলনা তৈরি করেন, তারা নিজেরাই বিভিন্ন স্থানে গিয়ে পাইকারী বাজারে বিক্রি করে আসেন। এখানকার দোলনা তৈরির কারিগর হোসনেয়ারা বেগম বাসসকে জানালেন, পুরো দোলনাটি তৈরি হয় কয়েকটি ধাপে এবং কয়েকজন কারিগরের মাধ্যমে। যেমন, একজন কেবল বাঁশের চাক বা চাঁকা তৈরি করেন। প্রতিটি বাঁশের চাকা তৈরির মজুরি ৩ থেকে ৪ টাকা। আবার একজন শুধু সেই বাঁশের চাকায় সুতা প্যাঁচান। প্রতিটি বাঁশের চাকায় সুতা পেঁচানোর মজুরি ৫ থেকে ৬ টাকা।

আবার একজন কেবল দো-লনা ঝুলিয়ে রাখার দড়ি বা চেইন তৈরি করেন। চেইন তৈরির মজুরি প্রতিটির জন্য ২ থেকে ৩ টাকা। তবে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন যিনি পুরো দো-লনাটি বুনেন। দোলনা তৈরির কারিগর পারভীন বেগম জানান, সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে দো-লনা তৈরি করেন। এ দো-লনা তৈরি করেই চলে তাদের সংসার। ছেলে-মেয়েরাও লেখাপড়া করছে। দো-লনা তৈরির সব কাজ তিনি নিজেই করেন। স্বামী-সন্তানরাও তার কাজে সহযোগিতা করেন। অর্চনা রানী সরকার জানান, দোলনা তৈরি এখানকার কয়েক শত নারী-পুরুষের ভাগ্য বদল করে দিয়েছে। শুধু দো-লনা তৈরি করেই তারা আজ সচ্ছল জীবন-যাপন করছেন।
দোল-নার বাঁশের চাকায় সুতা পেঁচানোর কাজ করেন ফাতেমা আকতার। তিনি জানান, তাদের মতো অনেক শিক্ষার্থী পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে দোলনার কাজ করে সংসারে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। দোল-নার চেইন তৈরির কারিগর শিরিন আকতার জানান, তাদের গ্রামে দো-লনা তৈরির প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে অনেক শিক্ষার্থী নিজেরাই নিজেদের পড়ালেখার খরচ জোগাতে পারছেন। দো-লনা ব্যবসায়ী নজির আহমেদ জানান, তাদের এ কুটির শিল্পের মাল কুমিল্লাসহ ঢাকা, চট্রগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী, বগুড়া, রাজশাহী, পাবনা, নেত্রকোনা, বরিশাল, টাঙ্গাইল, দিনাজপুর, রাঙ্গমাটি, খুলনা ও কক্সবাজার যায়।

তবে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা নিজেরা বাড়ীতে এসব পণ্য তৈরি করে বিক্রি করেন শহরে শহরে ফেরি করে। এরকম একজন হলেন, দৈয়ারা গ্রামের শহীদ। শহীদ জানান, তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিভিন্ন বাড়ী থেকে পণ্য এনে বিক্রি করেন শহরে। এছাড়াও মাপে ছোট বড় কিংবা অন্য কোন কারণে পণ্য সামান্য নষ্ট হলে তারা পণ্য বিক্রি করে দেয় তার কাছে। এভাবে শহরে ফেরি করে পণ্য বিক্রি করে তার দিনে ৫-৬শ’ টাকা লাভ হয়। এ কুটির শিল্পে ব্যবহৃত হয় পাহাড়ী বাস ও সুতা।
তবে এ পাহাড়ী বাঁশ কুমিল্লার মাধাইয়া বাজার থেকে প্রতি পিস দেড় থেকে ২০০ টাকায় এবং ঢাকার মোগরাপাড়া এলাকার রহমতগঞ্জ থেকে সাদা সুতা প্রতি কেজি ৮০ টাকা এনে এগুলো বিভিন্ন রং দ্বারা ডিজাইন করা হয়। শ্রমিকরা জানিয়েছেন, প্রতিটি দোল-না তৈরি করতে বাঁশের পরিমাণ কম লাগলেও সুতার প্রয়োজন হয় বেশি। প্রতি ১ কেজি সুতায় ছোট আকারের ১টি দোল-না তৈরি করা যায় বলে জানিয়েছেন তারা।