জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড : আলোচিত সমকামী অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব তনয় হত্যা মামলার রায়ে সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়াসসহ ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় এসেছে, পলাতক দুজন পেয়েছেন খালাস।
জুলহাজ-তনয় হত্যামামলায় ৬ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড, দুজন খালাস
মঙ্গলবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমানের আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গোলাম ছারোয়ার খান জাকির এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয়জন আসামি হলেন- নিষিদ্ধ জঙ্গি গোষ্ঠী আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সামরিক শাখার প্রধান মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়া, আকরাম হোসেন, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন, আরাফাত রহমান, শেখ আব্দুল্লাহ ও আসাদুল্লাহ।
এছাড়াও জঙ্গি গোষ্ঠী তাদের সবাইকে মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে পঞ্চাশ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হযেছে। পাশাপাশি আরেকটি ধারায় ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আসামীদের মধ্যে জিয়া ও আকরাম পলাতক। বাকি চারজনের উপস্থিতিতে বিচারক রায় ঘোষণা করেন।
আর অভিযোগে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত না হওয়ায় পলাতক আসামি সাব্বিরুল হক চৌধুরী এবং জুনাইদ আহমদ ওরফে মওলানা জুনায়েদ আহম্মেদ কে খালাস দিয়েছেন বিচারক।
দেশে ধারাবাহিক জঙ্গি হামলার মধ্যে ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল রাজধানীর কলাবাগানের লেক সার্কাস রোডের বাড়িতে প্রবেশ করে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ইউএসএইড কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু থিয়েটারকর্মী মাহবুব তনয়কে ।
জঙ্গি হামলার দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ১২ মে জিয়াসহ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক মুহম্মদ মনিরুল ইসলাম। এরপর গত ২০২০ সালের ১৯ নভেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত। দীর্ঘ নয় মাসের মাথায় বিচার শেষে রায় ঘোষণা হল।
এ মামলায় দণ্ডিত সবাই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের (আনসারুল্লাহ বাংলা টিম) সদস্য বলে তদন্তকারীদের ভাষ্য। তাদের মধ্যে জিয়া, মোজাম্মেল, আরাফাত ও আকরাম বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
‘দুই মাসের প্রস্তুতি’ ছিল খুনিদের
সমগ্র দেশে ‘উগ্রপন্থিদের’ একের পর এক হত্যা-হামলার মধ্যে ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল কলাবাগানে জুলহাজ মান্নান ও তনয়কে হত্যার ঘটনা পুরো দেশকে জঙ্গি এর ব্যাপারে নতুন করে চমকে দেয়।
৩৫ বছর বয়সী জুলহাজ মান্নান ছিলন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির খালাতো ভাই। ইউএসএইডের আগে তিনি ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের প্রটোকল অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবেও কাজ করেন। সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সাময়িকী ‘রূপবান’ সম্পাদনায় যুক্ত ছিলেন জুলহাজ।
আর তার বন্ধু ২৬ বছর বয়সী মাহবুব রাব্বী তনয় ছিলেন লোকনাট্য দলের কর্মী। পিটিএ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে ‘শিশু নাট্য প্রশিক্ষক’ হিসেবেও তিনি কাজ করতেন।
লেকসার্কাস রোডের আছিয়া নিবাস নামে ছয়তলা একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে মাকে নিয়ে থাকতেন জুলহাজ। সেদিন বিকাল ৫টার দিকে টি শার্ট ও প্যান্ট পরা একদল যুবক ওই বাসায় যায়।
পার্সেল দেওয়ার কথা বলে তারা জুলহাজ মান্নানের ফ্ল্যাটে যেতে চাইলে বাসার নিরাপত্তাকর্মী তাদের ঢুকতে দেন। নক করার পর জুলহাজ দরজা খুলে তাদের দেখে আবার দরজা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
তখন তারা জোর করে বাসায় ঢুকতে চাইলে নিরাপত্তাকর্মী পারভেজ মোল্লা বাধা দেন। পরে তারা ঘরে ঢুকে জুলহাজ ও তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করে।
‘আল্লাহু আকবার’ বলতে বলতে হামলাকারীরা আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন।
যাওয়ার পথে তাদের আটকাতে গিয়ে মমতাজ নামে পুলিশের একজন এএসআই জখম হন। তবে হামলাকারদের একজনের কাছ থেকে একটি ব্যাগ ছিনিয়ে রাখেন কলাবাগান এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এএসআই মমতাজ; সেখানে থেকে ১টি পিস্তল, ১টি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র, কয়েক রাউণ্ড গুলি ও মোবাইল ফোন পাওয়া যায়।
ঘটনার রাতেই জুলহাজের ভাই মিনহাজ মান্নান অজ্ঞাতপরিচয় পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করে কলাবাগান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এএসআই মমতাজের ওপর হামলা এবং অস্ত্র পাওয়ার ঘটনায় আরেকটি মামলা করেন কলাবাগান থানার এসআই শামীম আহমেদ। অস্ত্র আইনের ধারায় করা মামলাটি এখনও তদন্তাধীন।
তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে (আইও) পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পরিদর্শক মুহম্মদ মনিরুল ইসলাম কাজ করেছেন। তিনি ২০১৯ সালের ১২ মে জিয়াসহ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তখনকার উপ-কমিশনার মো. মাসুদুর রহমান বলেছিলেন, “এ মামলায় গ্রেপ্তার ৪ আসামি অপরাধে সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।”
“দীর্ঘ এই তদন্তে আসামিদের জবানবন্দি ও অন্যান্য সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে জানা গেছে, আসামিরা বাংলাদেশে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন আনসার আল ইসলামের বিভিন্ন পর্যায়ের সক্রিয় সদস্য। সংগঠনের নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হকের কথামত সংগঠনের সামরিক শাখার সদস্যরা ওই হত্যাকাণ্ড ঘটায়।”
১২ মে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তদন্ত করতে গিয়ে ওই হত্যাকাণ্ডে ১৩ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছিল কাউন্টার টেরোজিম ইউনিট। জঙ্গি অভিযোগপত্রের আট জন ছাড়া বাকিদের পূর্ণাঙ্গ নাম ঠিকানা পাওয়া যায়নি। সে কারণে তাদের আসামির তালিকায় রাখা সম্ভব হয়নি।